চেরি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, টক-মিষ্টি স্বাদের এবং প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ একটি প্রিমিয়াম ফল। আগে ধারণা করা হতো চেরি কেবল তীব্র ঠাণ্ডা পার্বত্য অঞ্চলেই চাষ সম্ভব। তবে বর্তমানে সমতল অঞ্চলের তীব্র গরম সহ্য করতে পারে এমন কিছু চমৎকার উষ্ণ জলবায়ু সহনশীল (Low-chill) জাত আবিষ্কার হয়েছে। ছাদবাগানে টবে বা ড্রামে চাষের জন্য এই জাতগুলোর কলমের চারা দারুণ উপযোগী।
চেরি (Cherry)
বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name):Prunus avium (মিষ্টি চেরি) বা Prunus cerasus (টক চেরি)।
দ্রষ্টব্য: ছাদবাগানে অনেকে 'বার্বাডোজ চেরি' বা 'মালপিঘিয়া চেরি' (Barbados Cherry) চাষ করেন, যা দেখতে চেরির মতো হলেও আসল চেরি নয়। আসল চেরি হলো প্লাম বা আলুবোখরার গোত্রীয় ফল।
অন্যান্য নাম (Other Common Names): চেরি ফল (হিন্দি ও বাংলা)।
ছাদবাগানের জন্য উপযোগী জাত (Hot-Climate Varieties): সমতল অঞ্চলের তীব্র গরমের জন্য 'মিনি রয়্যাল' (Mini Royal) এবং 'রয়্যাল লি' (Royal Lee) জাত দুটি সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয়, যা সমতলের কড়া রোদেও চমৎকার ফল দেয়।
গাছের ধরন (Plant Type): এটি একটি ছোট থেকে মাঝারি আকারের, বহুবর্ষজীবী (Perennial) এবং পর্ণমোচী বা পাতাঝরা (Deciduous) কাস্টল উদ্ভিদ। এর পাতাগুলো ডিম্বাকার, খসখসে এবং কিনারা খাঁজকাটা হয়। ছাদবাগানের জন্য সবসময় জোড় কলমের (Grafted) চারা ব্যবহার করা আবশ্যক। কলমের চারা লাগানোর ২-৩ বছরের মধ্যেই এবং মাত্র ৩-৪ ফুট উচ্চতা থেকেই গাছে ফুল ও ফল আসতে শুরু করে। সাধারণত বসন্তের শুরুতে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) গাছে থোকা থোকা চমৎকার সাদা বা হালকা গোলাপি ফুল আসে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে (মে-জুন) ফল পাকে। কাঁচা অবস্থায় ফলটি সবুজ থাকে এবং পাকলে টকটকে লাল বা গাঢ় চেরি রঙ ধারণ করে।
১. মাটির মিশ্রণ (Potting Mixture)
চেরি গাছ হালকা অম্লীয় থেকে নিরপেক্ষ (pH ৬.০ - ৭.০) এবং চমৎকার জলনিকাশী বালি-দোআঁশ মাটি পছন্দ করে। টবের মাটিতে জল জমে থাকা এই গাছের শিকড় পচার প্রধান কারণ। আদর্শ মিশ্রণ:
বাগানের সাধারণ দোআঁশ মাটি: ৫০%
ভার্মিকম্পোস্ট বা পুরনো পচা গোবর সার: ৩০%
নদীর কাদা ছাড়া বালি: ২০% (জল দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য)
(মাটির পুষ্টি ও সুরক্ষার জন্য এর সাথে ২ মুঠো হাড়ের গুঁড়ো, ২ মুঠো নিম খোল এবং ১ চামচ ফাঙ্গিসাইড পাউডার খুব ভালো করে মিশিয়ে মাটি তৈরি করুন)।
টবের আকার: চেরি গাছের শিকড় ছড়ানোর জন্য শুরুতে ১২-১৪ ইঞ্চির টব এবং গাছ একটু বড় হলে অন্তত ১৬-১৮ ইঞ্চির বড় টব বা হাফ ড্রাম ব্যবহার করা আবশ্যক।
২. পরিচর্যা নির্দেশিকা (Care Guide)
জল দেওয়ার নিয়ম: চেরি গাছ মাটিতে হালকা আর্দ্রতা বা ভেজা ভাব পছন্দ করে, তবে অতিরিক্ত জল একদম সহ্য করতে পারে না। টবের মাটির ওপরের স্তর শুকিয়ে গেলেই জল দিন। विशेष নিয়ম: শীতের শেষে (ফেব্রুয়ারি) যখন গাছে ফুল আসবে, তখন জল দেওয়ার পরিমাণ সামান্য কমিয়ে দিতে হবে। ফুল ফুটে থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত জল দিলে ফুল ঝরে যায়। ফুল থেকে যখন ছোট ছোট চেরির গুটি তৈরি হয়ে যাবে, তখন থেকে ফল পাকা পর্যন্ত আবার নিয়মিত পর্যাপ্ত জল দিতে হবে (জলের অভাব হলে ফল আকারে ছোট হয় এবং অকালে ঝরে যায়)। শীতকালে যখন পাতাঝরার মরশুম চলবে, তখন জল দেওয়া অনেক কমিয়ে দিন।
সূর্যালোক: এটি একটি রোদ পছন্দ করা গাছ। প্রচুর ফুল এবং ফলের সুন্দর টকটকে লাল রঙের জন্য দিনে অন্তত ৬-৭ ঘণ্টা সরাসরি উজ্জ্বল ও কড়া সূর্যালোক পায় এমন খোলামেলা জায়গায় টবটি রাখুন।
পাতা ঝরার মরশুম ও ছাঁটাই (Dormancy & Pruning): শীতকালের শুরুতে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) চেরি গাছের সব পাতা হলুদ হয়ে ঝরে যায় এবং গাছটি সম্পূর্ণ সুপ্তাবস্থায় (Dormancy) চলে যায়। এটি এই গাছের একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে গাছের অগ্রভাগের অতিরিক্ত লম্বা, আঁকাবাঁকা বা শুকনো ডালগুলো ধারালো কাঁচি দিয়ে হালকা ছেঁটে (Pruning) দিতে পারেন। ছাঁটাইয়ের পর কাটা অংশে ফাঙ্গিসাইড লাগিয়ে দিন।
সার প্রয়োগ: বছরে তিনবার (জানুয়ারি মাসের ছাঁটাইয়ের পর, মে মাসে এবং সেপ্টেম্বর মাসে) টবের চারপাশের মাটি সামান্য খুঁড়ে প্রচুর কম্পোস্ট সার, হাড়ের গুঁড়ো এবং সামান্য পটাশ সার (ফলের মিষ্টিভাব ও আকার বাড়াতে) দিন। ফল বড় হওয়ার সময় প্রতি ১৫ দিন অন্তর পাতলা করে তৈরি করা সরষের খোল পচা তরল সার দেওয়া খুব উপকারী।
৩. সাধারণ রোগ, পোকা-মাকড় ও প্রতিকার (Diseases, Pests & Cure)
সমস্যা:
জাব পোকা ও থ্রিপস (Aphids & Thrips): বসন্তকালে নতুন কচি পাতা ও ফুলের থোকায় এই ছোট ছোট পোকা লেগে রস চুষে খায় এবং পাতা কুঁকড়ে দেয়।
ফল মাছি ও পাখি: চেরি যখন পাকতে শুরু করে এবং টকটকে লাল হয়, তখন এর মিষ্টি গন্ধ ও আকর্ষণে পাখি, কাঠবিড়ালি এবং ফল মাছির উপদ্রব মারাত্মক বেড়ে যায়।
ব্রাউন রট বা ফল পচা (Brown Rot): এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এর আক্রমণে পাকা ফলের গায়ে বাদামী দাগ পড়ে এবং ফলটি পচে শুকিয়ে ডালপাতেই ঝুলে থাকে।
প্রতিকার:
সাধারণ পোকা-মাকড়ের উপদ্বব কমাতে ১০-১২ দিন অন্তর ১ লিটার জলে ২ মিলি নিম তেল এবং কয়েক ফোঁটা লিকুইড সোপ মিশিয়ে পুরো গাছে ভালো করে স্প্রে করুন।
পাখি, কাঠবিড়ালি এবং ফল মাছির হাত থেকে নরম রসালো ফল বাঁচাতে, চেরির গুটি তৈরি হলেই পুরো গাছটি মশারির মতো হালকা নেট দিয়ে ঢেকে (Fruit Bagging/Netting) দিন। ছাদবাগানে চেরি বাঁচানোর এটিই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
ছত্রাকের আক্রমণ বা ব্রাউন রট এড়াতে ১ লিটার জলে ২ গ্রাম ফাঙ্গিসাইড (যেমন: সাফ) গুলে গাছে স্প্রে করুন।