আরকা নীলাচল কেশরী (Arka Neelachal Kesri)
উদ্ভাবন ও নির্বাচনের বিবরণ (Invention & Selection Details)
-
উদ্ভাবক ও গবেষণা কেন্দ্র: ভারতের কর্ণাটকের আইসিএআর-আইআইএইচআর (ICAR-IIHR)-এর অধীনে ওড়িশার ভুবনেশ্বরে অবস্থিত আঞ্চলিক কেন্দ্র কেন্দ্রীয় উদ্যানপালন পরীক্ষা কেন্দ্র (CHES – Central Horticultural Experiment Station, Bhubaneswar)-এর বিজ্ঞানীদের এক অনবদ্য সৃষ্টি। ওড়িশা সহ পূর্ব ভারতের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর উপযোগী একটি নিয়মিত ফলনশীল ও প্রিমিয়াম আগাম জাতের চাহিদা মেটাতে এই লাইনটি নির্বাচন করা হয়।
-
বংশানুক্রম ও নির্বাচনের বিবরণ: এটি কোনো কৃত্রিম সংকরায়ণ বা হাইব্রিড জাত নয়। এটি মূলত উত্তর ও পূর্ব ভারতের ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধী জাত ‘গুলাব খাস’ (Gulab Khas) আমের একটি উন্নত ওপেন-পোলিনেটেড চারা সিলেকশন (Selection from open-pollinated seedlings)। গুলাব খাস আমের একটি বড় পপুলেশন থেকে তার চমৎকার বাণিজ্যিক গুণের কারণে এই বিশেষ গাছটি নির্বাচন (Select) করা হয়।
জাতের বৈশিষ্ট্য (Cultivar Characteristics)
-
উৎস ও প্রধান অঞ্চল: ভুবনেশ্বর (ওড়িশা, ভারত)। ওড়িশার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড এবং বিহারের আম চাষীদের মাঝে আগাম বাণিজ্যিক জাত হিসেবে এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
-
গাছের বৃদ্ধি: এটি একটি আধা-বামন বা মাঝারি আকৃতির নিয়ন্ত্রিত গাছ (Semi-dwarf Habit)। এর ক্যানোপি বেশ সুষম ও কমপ্যাক্ট প্রকৃতির হয়, যার ফলে সাধারণ আম গাছের চেয়ে অনেক কম জায়গায় এটি রোপণ করা যায় এবং নিবিড় বাগান ব্যবস্থাপনার জন্য এটি দারুণ উপযোগী।
-
ফলন ও ফলনের ধরন: উচ্চ ফলনশীল এবং শতভাগ নিয়মিত ফলন দেয় (Regular Bearer)। প্রথাগত গুলাব খাস আম যেখানে সাধারণত এক বছর অন্তর ফলন (Alternate Bearing) দেয়, সেখানে এই সিলেকশনটি প্রতি বছরই গাছের ডালে প্রচুর পরিমাণে আম উৎপাদন করতে সক্ষম।
-
টিএসএস ব্রিক্স (মিষ্টতা): ২০ – ২১ (চমৎকার কড়া মিষ্টি স্বাদ)।
-
ওজন: ২৫০ – ৩৫০ গ্রাম (মাঝারি এবং সুষম বাণিজ্যিক ওজনের আম)।
-
আকৃতি ও গায়ের রঙ: এর আকৃতি বেশ সুন্দর—সুمنোজ্ঞ ওভাল-অবলং (Oval-oblong) বা ডিম্বাকৃতি। সম্পূর্ণ পাকার পর এর মসৃণ ত্বকটি একটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন উজ্জ্বল হলুদাভ-কমলা বা সোনালী-হলুদ (Bright Golden-Yellow) রঙ ধারণ করে এবং সূর্যের আলো পাওয়া অংশে গুলাব খাসের মতোই একটি চমৎকার লালচে আভা বা ব্ল্যাশ (Attractive Red Blush) দেখা যায়।
-
শাঁসের রঙ ও টেক্সচার: নামের সাথেই ‘কেশরী’ শব্দটি যুক্ত থাকার সার্থকতা পাওয়া যায় এর শাঁস দেখলে। এর ভেতরের শাঁসটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় গাঢ় কমলা বা কেসরী রঙ (Deep Orange / Saffron color) ধারণ করে, যা প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন (ভিটামিন-এ) সমৃদ্ধ। এর শাঁস অত্যন্ত নিরেট, মাংসল, রসালো এবং সম্পূর্ণ আঁশহীন (Fiberless)। এর ভেতরের আঁটিটি বেশ ছোট ও পাতলা হয়।
-
পাকার সময়: আরকা নীলাচল কেশরী আমের সবচেয়ে বড় ইউএসপি (USP) হলো এটি একটি অত্যন্ত সফল আগাম মরশুমের (Early Season) জাত। সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে জুনের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই এটি সম্পূর্ণ পাকার এবং খাওয়ার উপযুক্ত সময় হয়ে যায়। পূর্ব ভারতে যখন বাজারের অন্যান্য প্রিমিয়াম আম পাকার ঢের বাকি থাকে, তখন এই আমটি পেকে বাজারে চড়া দাম তুলে নেয়।
-
সংরক্ষণ গুণমান: বেশ ভালো (Good shelf life)। সম্পূর্ণ পাকার পরেও এর ভেতরের শাঁসটি চমৎকার নিরেট ও শক্ত থাকে এবং এর চামড়া সহজে নরম হয় না। ফলে ঘরের তাপমাত্রায় অনায়াসে ৪-৫ দিন এটি তাজা থাকে এবং দূরবর্তী বাজারে পরিবহনে ফলের কোনো ক্ষতি হয় না।
-
স্বাদ ও সুবাস: আরকা নীলাচল কেশরী আমটি তার সমৃদ্ধ মিষ্টি স্বাদ এবং মূল জাত গুলাব খাস থেকে পাওয়া একটি চমৎকার তীব্র মনমুগ্ধকর ফ্রুটি সুবাসের (Delightful fruity aroma) জন্য সমাদৃত। মুখে দেওয়ার সাথে সাথেই এর আঁশহীন মাখনের মতো ঘন শাঁস গলে যায় এবং খাওয়ার পর মুখে একটি চমৎকার ক্রান্তীয় আফটার-টেস্ট রেখে যায়। আগাম জাত হিসেবে সরাসরি কেটে খাওয়ার জন্য এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক এবং প্রিমিয়াম আম।


















