গ্র্যান্ডিফ্লোরা গোলাপ (Grandiflora Roses) আধুনিক গোলাপ চাষের জগতে এক অনন্য, রাজকীয় এবং অত্যন্ত চমৎকার একটি শ্রেণী। ১৯৫৪ সালে বিশ্ববিখ্যাত গোলাপ ‘কুইন এলিজাবেথ’ (Queen Elizabeth)-এর আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে এই বিশেষ শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। এটি মূলত দুটি ভিন্ন ধারার গোলাপ—হাইব্রিড টি (Hybrid\ Tea) এবং ফ্লোরিবান্ডা (Floribunda)-র সংকরায়ণ বা ক্রসের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।
এর ফলে গ্র্যান্ডিফ্লোরা গোলাপ হাইব্রিড টি-র মতো বড় আকার ও নিখুঁত ক্লাসিক গঠন পেয়েছে, আবার ফ্লোরিবান্ডার মতো একটি ডালে থোকায় থোকায় (Clusters) প্রচুর ফুল ফোটানোর ক্ষমতা পেয়েছে। সোজা কথায়, যারা একটি গাছে একই সাথে হাইব্রিড টি-র মতো বড় ফুল এবং ফ্লোরিবান্ডার মতো উপচে পড়া ফুলের মেলা দেখতে চান, তাদের জন্য গ্র্যান্ডিফ্লোরা গোলাপ এক পরম আশীর্বাদ।
প্রধান বৈশিষ্ট্য (Characteristics)
-
বিশালাকার ও থোকা ফুল (The Hybrid Vigor): এর ফুলগুলো আকারে বেশ বড় (সাধারণত ৩ থেকে ৫ ইঞ্চি চওড়া) হয়। হাইব্রিড টি গোলাপের মতো এরা একটি ডালে একটি না ফুটে, প্রতিটি লম্বা ও শক্ত ডালের ডগায় ৩ থেকে ৫টি ফুলের বড় বড় চমৎকার গুচ্ছ বা থোকায় ফোটে।
-
লম্বা ও শক্ত ডালপালা (Upright and Tall Bush): গ্র্যান্ডিফ্লোরা গোলাপ গাছ প্রাকৃতিকভাবেই বেশ লম্বা, সোজা এবং শক্তপোক্ত (Upright and Vigorous) ঝোপ তৈরি করে। এরা অনায়াসে ৫ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, যা বাগানের ব্যাকগ্রাউন্ড বা হেজ (Hedge) তৈরির জন্য দারুণ।
-
দীর্ঘস্থায়ী ও সুগন্ধি পাপড়ি: এর ফুলগুলোর পাপড়ি বেশ পুরু ও মোমের মতো হওয়ায় ফোটার পর অনেকদিন পর্যন্ত সতেজ থাকে। বহু জাতের গ্র্যান্ডিফ্লোরা গোলাপে চমৎকার মিষ্টি সুবাস থাকে যা পুরো বাগানকে আমোদিত করে।
-
বারোমাসি ব্লুমার (Continuous Bloomer): শরৎকালের শুরু থেকে শুরু করে পুরো শীত ও বসন্তকাল জুড়ে (আমাদের দেশের আবহাওয়ায়) এই গাছে তরঙ্গে তরঙ্গে অনবরত ফুলের জোয়ার আসতেই থাকে।
কিছু জনপ্রিয় গ্র্যান্ডিফ্লোরা গোলাপের জাত (Popular Varieties)
-
১. কুইন এলিজাবেথ (Queen Elizabeth): এটি ইতিহাসের প্রথম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত গ্র্যান্ডিফ্লোরা গোলাপ। এর ফুলগুলো অত্যন্ত মার্জিত, নরম অর্কিড-গোলাপি (Orchid\ Pink) রঙের হয়। গাছটি অত্যন্ত শক্তিশালী, রোগবালাই প্রতিরোধী এবং এটি জাদুর মতো দ্রুত বাড়ে।
-
২. চেরি পারফেইট (Cherry Parfait): আপনি যদি দ্বি-রঙা গোলাপ পছন্দ করেন, তবে এটি আপনার সেরা পছন্দ। এর পাপড়িগুলোর ভেতরের অংশ সাদা বা ক্রিম রঙের হয়, আর চারপাশের বর্ডার জুড়ে থাকে টকটকে চেরি-লাল রঙের ছোঁয়া। দূর থেকে এর থোকা ফুলগুলো দেখতে অসাধারণ লাগে।
-
৩. গোল্ড মেডেল (Gold Medal): এটি গ্র্যান্ডিফ্লোরা শ্রেণীর অন্যতম সেরা হলুদ গোলাপ। এর কুঁড়িগুলো গাঢ় সোনা-হলুদ রঙের হলেও ফোটার পর পাপড়ির কিনারায় হালকা কমলাভ-লাল আভা দেখা যায়। এর সুবাস অত্যন্ত মিষ্টি ও তীব্র।
-
৪. ডিক ক্লার্ক (Dick Clark): এটি একটি গিরগিটির মতো রঙ বদলানো জাদুকরী গোলাপ! এর কুঁড়িগুলো কালো-লাল রঙের হলেও ফোটার সাথে সাথে পাপড়ির কেন্দ্র ক্রিম-হলুদ এবং কিনারাগুলো চেরি-লাল রঙ ধারণ করে। কড়া সূর্যালোক পেলে এর লাল রঙ আরও বেশি গাঢ় হয়ে ওঠে।
-
৫. টুয়াইলাইট জোন (Twilight Zone): যারা ডার্ক বা রহস্যময় রঙ পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি একটি মাস্টারপিস। এর ফুলগুলো মখমলের মতো গাঢ় বেগুনি (Deep Velvet Purple) রঙের হয় এবং এর থেকে ওল্ড-রোজ ও সাইট্রাসের এক তীব্র মনমাতানো সুবাস পাওয়া যায়।
পরিচর্যা নির্দেশিকা (Care Guide)
১. মাটির মিশ্রণ ও টব নির্বাচন
গ্র্যান্ডিফ্লোরা গোলাপ ভারী ও উর্বর মাটি পছন্দ করে। আদর্শ মিশ্রণ:
-
দোআঁশ মাটি: ৫০% | পুরনো পচা গোবর বা ভার্মিকম্পোস্ট: ৩০% | নদীর সাদা বালি: ২০%
-
(এর সাথে ১ মুঠো হাড়ের গুঁড়ো, ১ মুঠো শিং কুচি এবং ১ চামচ ফাঙ্গিসাইড পাউডার খুব ভালো করে মিশিয়ে নেবেন)।
-
টব নির্বাচন: যেহেতু এই গাছগুলো বেশ লম্বা ও বড় ঝোপ তৈরি করে, তাই এদের জন্য অন্তত ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চির বড় মাটির টব বা ড্রাম ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো।
২. জল ও সূর্যালোক নিয়ন্ত্রণ
-
জল: গোলাপের মাটিতে ময়েশ্চার বা হালকা আর্দ্রতা জরুরি, তবে গোড়ায় জল জমে কাদা হওয়া এটি একদম সহ্য করতে পারে না। টবের মাটির ওপরের স্তর শুকিয়ে গেলে তবেই পরিমিত জল দিন। সকালে জল দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
-
সূর্যালোক (সবচেয়ে জরুরি): এটি পুরোপুরি একটি সূর্যপ্রেমী গাছ। প্রচুর পরিমাণে বড় বড় ফুলের থোকা পেতে একে ছাদবাগানের এমন জায়গায় রাখুন যেখানে দিনে অন্তত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সরাসরি উজ্জ্বল সূর্যালোক পাওয়া যায়।
৩. সার প্রয়োগ ও ছাঁটাই (Pruning)
-
খাবার: ফুল ফোটার মরসুমে প্রতি ১৫ দিন অন্তর পাতলা করে সরষের খোল পচা জল অথবা মিক্সড জৈব সার দিন। ফুলের সাইজ বড় করতে প্রতি মাসে ১ চামচ পটাশ সার (SOP) গোড়ার মাটিতে মিশিয়ে জল দিন।
-
শীতের শুরুতে ছাঁটাই (Pruning): প্রতি বছর অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে গাছের সমস্ত শুকনো, রোগাক্রান্ত বা অতিরিক্ত ডালপালা কাঁচি দিয়ে মাঝারি আকারে ছেঁটে (Moderate Pruning) দিন। ছাঁটাইয়ের পর কাটা অংশে অবশ্যই ফাঙ্গিসাইড পেস্ট লাগিয়ে দেবেন।


















