মোহনভোগ (Mohanbhog Mango)
ইতিহাস ও নামকরণ: ‘মোহনভোগ’ মূলত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া জেলা) এবং বাংলাদেশের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের একটি অত্যন্ত প্রাচীন, বিখ্যাত এবং রাজকীয় হেরিটেজ আম। এর নামকরণটি করা হয়েছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ দুটি বাংলা শব্দ থেকে: ‘মোহন’ (যার অর্থ মন হরণকারী বা অত্যন্ত সুন্দর, যা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম) এবং ‘ভোগ’ (যার অর্থ রাজকীয় খাবার বা দেবতাকে নিবেদিত প্রসাদ)। লোককথা ও নবাবী আমলের ইতিহাস অনুযায়ী, এই আমের মনকাড়া রূপ, নিখুঁত গঠন এবং ক্ষীরের মতো ঘন মিষ্টি স্বাদ বাংলার নবাব ও জমিদারদের মন হরণ করেছিল। রাজকীয় ভোজের শেষে ডেজার্ট বা মিষ্টি হিসেবে এটি পরিবেশন করা হতো বলেই এর নাম রাখা হয় ‘মোহনভোগ’।
উৎস: মালদা ও মুর্শিদাবাদ (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ (বাংলাদেশ)। গাছের বৃদ্ধি: মাঝারি থেকে শক্তিশালী এবং একটি সুন্দর সুষম, ছড়ানো ও ঘন আকৃতির ক্যানোপি (Moderately Vigorous and Spreading Canopy)। ফলন: মাঝারি থেকে উচ্চ ফলনশীল (Good Yielder)। ফলনের ধরন: মূলত এক বছর অন্তর ভালো ফলন দেয় (Alternate Bearer), তবে সঠিক পরিচর্যায় প্রতি বছরই ভালো ফলন সম্ভব। টিএসএস ব্রিক্স (মিষ্টতা): ২০ – ২২ (চমৎকার কড়া ও রাজকীয় মিষ্টতা)। ওজন: ২৫০ – ৪০০ গ্রাম (মাঝারি থেকে বেশ ভরাট ও বড় আকার)। আকৃতি ও গায়ের রঙ: এর আকৃতি বেশ চমৎকার ও গোলগাল ডিম্বাকৃতি (Roundish Oval)। কাঁচা অবস্থায় এর গায়ের রঙ গাঢ় সবুজ থাকে। সম্পূর্ণ পাকার পর এর মসৃণ ত্বকটি একটি অত্যন্ত মনোহর ও উজ্জ্বল সোনালী-হলুদ (Bright Golden-Yellow) রঙ ধারণ করে। এর চামড়া বেশ পরিষ্কার ও আকর্ষণীয় হয়। শাঁসের রঙ: আকর্ষণীয় গাঢ় সোনা-হলুদ থেকে উজ্জ্বল কেসরী বা কমলা-হলুদ। পাকার সময়: এটি মূলত একটি মধ্য থেকে নাবি মরশুমের (Mid to Late Season) জাত। সাধারণত জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করে জুনের শেষ পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ পাকার এবং খাওয়ার উপযুক্ত সময়। সংরক্ষণ গুণমান: বেশ ভালো (Good shelf life)। চামড়া মাঝারি পুরু এবং ভেতরের শাঁস বেশ নিরেট হওয়ায় সম্পূর্ণ পাকার পরেও এটি সহজে নরম বা নষ্ট হয়ে যায় না। ঘরের তাপমাত্রায় অনায়াসে ৫-৭ দিন চমৎকার থাকে। স্বাদ ও সুবাস: মোহনভোগ আমটি তার অত্যন্ত অনন্য, ঘন এবং রাজকীয় টেক্সচারের জন্য বিখ্যাত। এর শাঁস অত্যন্ত মাংসল, মাখনের মতো মসৃণ এবং সম্পূর্ণ আঁশহীন (Fiberless)। এর ভেতরের আঁটিটি (Stone) বেশ পাতলা হয়, ফলে ছোট-মাঝারি আম হলেও এতে খাওয়ার মতো প্রচুর শাঁস থাকে। স্বাদের দিক থেকে এটি তীব্র মিষ্টি, তবে এর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর শাঁসে থাকা একটি মৃদু ও অত্যন্ত পরিশীলিত ক্ষীরের মতো ফ্লেভার (Rich creamy taste with delightful aroma)। মুখে দিলে এর শাঁস চমৎকারভাবে গলে যায় এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী বনেদি আফটার-টেস্ট রেখে যায়। এটি চামচ দিয়ে স্কুপ করে বা টুকরো করে কেটে টেবিল ফ্রুট হিসেবে রাজকীয় কায়দায় খাওয়ার জন্য একটি দারুণ অভিজাত ও ঐতিহ্যবাহী আম।
(তথ্যসূত্র: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য উদ্যানপালন ঐতিহ্য সমীক্ষা, মালদা আম গবেষণা কেন্দ্র এবং আঞ্চলিক দেশি আম বৈচিত্র্য সংরক্ষণ রেকর্ড)









