নীলম (Neelum / Neelam)
ইতিহাস ও নামকরণ: ‘নীলম’ ভারতের একটি অত্যন্ত প্রাচীন, সুপরিচিত এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল জাতের আম। এর নামকরণ করা হয়েছে মূল্যবান রত্ন “নীলা” বা নীলাকান্ত মণি (Sapphire)-এর নামানুসারে। নীলম নামের আড়ালে যেমন এক তীব্র আভিজাত্য জড়িয়ে আছে, তেমনই এর চমৎকার রঙ এবং সুষম আকার এটিকে বাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি মূলত দক্ষিণ ভারতের জাত হলেও বর্তমানে এর চমৎকার অভিযোজন ক্ষমতার কারণে সমগ্র ভারত ও বাংলাদেশে এর ব্যাপক চাষ হয়। আম প্রজনন বা হাইব্রিডাইজেশনের ক্ষেত্রে নীলম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাত; ভারতের বিখ্যাত দুই হাইব্রিড আম ‘আম্রপালি’ (দশহরি X নীলম) এবং ‘মল্লিকা’ (নীলম X দশহরি)-র অন্যতম অভিভাবক (Parent) হলো এই নীলম।
উৎস: দক্ষিণ ভারত (প্রধানত তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কর্ণাটক)।
গাছের বৃদ্ধি: মাঝারি আকৃতির এবং কিছুটা কম ছড়ানো (Moderately Vigorous and Compact), যা হাই-ডেন্সিটি বা ঘন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত।
ফলন: অত্যন্ত উচ্চ ফলনশীল (Heavy Yielder)।
ফলনের ধরন: এটি একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য নিয়মিত ফলনশীল (Regular Bearer) জাত। প্রতি বছর এটি প্রচুর পরিমাণে ফল দেয়।
টিএসএস ব্রিক্স (মিষ্টতা): ১৮ – ২০
ওজন: ২০০ -৩০০ গ্রাম (ছোট থেকে মাঝারি আকার, অত্যন্ত সুষম ডিম্বাকৃতি এবং মসৃণ গড়ন)।
গায়ের রঙ: কাঁচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ। সম্পূর্ণ পাকার পর এর মসৃণ ও পাতলা ত্বকটি একটি চোখধাঁধানো উজ্জ্বল সোনালী-হলুদ থেকে জাফরানি হলুদ (Bright Golden Yellow) রঙ ধারণ করে। এর রূপ বাজারে ক্রেতাদের সহজেই আকর্ষণ করে।
শাঁসের রঙ: আকর্ষণীয় গাঢ় হলুদ বা হালকা কেসরী হলুদ।
পাকার সময়: এটি একটি অত্যন্ত বিখ্যাত নাবি মরশুমের (Late Season) জাত। যখন বাজারের অন্যান্য প্রধান আম (যেমন আলফানজো, ল্যাংড়া, হিমসাগর) শেষ হয়ে আসে, তখন নীলম বাজারে রাজত্ব করতে শুরু করে। সাধারণত জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু করে পুরো জুলাই এবং আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এটি পাওয়া যায়।
সংরক্ষণ গুণমান: অসাধারণ (Excellent keeping quality)। এর চামড়া পাতলা হলেও বেশ টেকসই এবং ভেতরের শাঁস নিরেট হওয়ায় গাছ থেকে পাড়ার পর ঘরের তাপমাত্রায় অনায়াসে ১২-১৫ দিন চমৎকার থাকে। দূরপাল্লার পরিবহন এবং রপ্তানির জন্য এটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।
স্বাদ ও সুবাস: নীলম আমের শাঁস বেশ নিরেট (Firm), মাখনের মতো মসৃণ এবং সম্পূর্ণ আঁশহীন (Fiberless)। স্বাদের দিক থেকে এটি চমৎকার মিষ্টি, তবে এর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর শাঁসে থাকা একটি হালকা ও মনোরম টক ভাবের দারুণ সুষম ভারসাম্য এবং একটি চমৎকার মৃদু সুবাস। এর শক্ত গঠনের কারণে এটি কেটে টুকরো করে খাওয়ার (Table Fruit) জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। মরশুমের শেষে আমপ্রেমীদের মিষ্টির তৃষ্ণা মেটাতে নীলম জুড়িহীন।
(তথ্যসূত্র: National Horticulture Board-NHB, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-TNAU এবং আইসিএআর-IIHR)


























