ভ্যালেন্সিয়া কমলা (Valencia Orange) বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয়, সুপরিচিত এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল একটি সুইট অরেঞ্জ বা মিষ্টি কমলার জাত। সারাবিশ্বে যে কমলার জুস বা রস আমরা প্যাকেটজাত অবস্থায় দেখতে পাই, তার সিংহভাগই আসে এই ভ্যালেন্সিয়া কমলা থেকে। ছাদবাগানীদের কাছে এটি একটি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও চমৎকার জাত, কারণ এটি অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির, সমতলের তীব্র গরম আবহাওয়ায় দারুণভাবে টিকে থাকে এবং টবে বা হাফ ড্রামে প্রচুর ফলন দেয়।
ভ্যালেন্সিয়া কমলা (Valencia Orange)
-
বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name): Citrus sinensis ‘Valencia’
-
উৎস ও ইতিহাস: নামের কারণে অনেকেই এটিকে স্পেনের জাত মনে করলেও, এই জাতটি মূলত ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রথম সফলভাবে উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে স্পেনের বিখ্যাত সাইট্রাস অঞ্চল ‘ভ্যালেন্সিয়া’-র নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়।
-
ফলের বৈশিষ্ট্য: ভ্যালেন্সিয়া কমলা আকারে মাঝারি থেকে বেশ বড় এবং নিখুঁত গোলাকার বা সামান্য ডিম্বাকার হয়। এর গায়ের খোসাটি মাঝারি পুরু, মসৃণ এবং সম্পূর্ণ পাকার পর উজ্জ্বল গাঢ় কমলা (Bright Orange) বর্ণ ধারণ করে। এর খোসাটি বেশ টাইট প্রকৃতির (Tight-skinned) হওয়ায় এটি গাছ থেকে তোলার পরও দীর্ঘ সময় তাজা থাকে।
-
স্বাদ ও শাঁস: ভ্যালেন্সিয়া কমলার মূল খ্যাতি এর অবিশ্বাস্য রসালো ভাবের (Extremely Juicy) জন্য। এর ভেতরের শাঁসটি গাঢ় কমলা রঙের এবং অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত হয়। এর স্বাদ তীব্র মিষ্টি এবং এতে সাইট্রাসের একটি হালকা মনোরম টক ভাব (Sweet-Tangy Balance) থাকে, যা জুস তৈরির জন্য এটিকে পৃথিবীর এক নম্বর কমলার খেতাব এনে দিয়েছে। এতে বীজের সংখ্যা খুবই কম (১ থেকে ৩টি) বা প্রায় থাকেই না।
-
গাছের ধরন (Plant Type): এটি একটি শক্ত কান্ডবিশিষ্ট, ঝোপালো, বহু-শাখা যুক্ত এবং চিরসবুজ (Evergreen) বহুবর্ষজীবী গাছ। এর বৃদ্ধির গতি বেশ ভালো এবং এটি একটি স্ব-পরাগায়িত (Self-fertile) জাত।
১. মাটির মিশ্রণ ও ড্রাম নির্বাচন
সাইট্রাস জাতীয় অন্যান্য গাছের মতোই ভ্যালেন্সিয়া কমলা গাছ মাটি সামান্য অম্লীয় পছন্দ করলেও গোড়ায় জল জমে থাকা একদম সহ্য করতে পারে না। আদর্শ মিশ্রণ:
-
বাগানের সাধারণ দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি: ৫০%
-
ভার্মিকম্পোস্ট বা পুরনো পচা গোবর সার: ৩০%
-
নদীর কাদারহিত বালি বা পার্লাইট: ২০%
-
(মাটির পুষ্টি ও সুরক্ষার জন্য এর সাথে ২ মুঠো হাড়ের গুঁড়ো, ২ মুঠো শিং কুচি, ২ মুঠো নিম খোল এবং ১ চামচ ফাঙ্গিসাইড পাউডার খুব ভালো করে মিশিয়ে মাটি তৈরি করুন)।
-
টব বা ড্রামের আকার: ভ্যালেন্সিয়া কমলার ভালো ফলন ধরে রাখতে ছাদবাগানের ড্রাম নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। (APU Nursery) অপু নার্সারি থেকে কলমের চারা কিনে শুরুতে অন্তত ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চির টব ব্যবহার করতে পারেন। তবে গাছটি যখন ১ বছর পেরিয়ে যাবে, তখন প্রচুর ফলন পেতে একে অবশ্যই ১৮ থেকে ২২ ইঞ্চির একটি হাফ ড্রামে প্রতিস্থাপন করতে হবে।
২. পরিচর্যা নির্দেশিকা (Care Guide)
-
জল দেওয়ার নিয়ম: মাটিতে সবসময় হালকা আর্দ্রতা বজায় রাখুন, কিন্তু মাটি কাদা করবেন না। মাটির ওপরের স্তর সামান্য শুকিয়ে গেলেই জল দিন। বিশেষ সতর্কতা: শীতের শেষে গাছে যখন নতুন পাতা এবং ফুলের কুঁড়ি আসবে, তখন জল দেওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিতে হবে (মাটি যেন একদম শুকিয়ে কাঠ না হয়)। এই সময়ে অতিরিক্ত জল দিলে সব ফুল ঝরে যাবে। ফুল থেকে গুটি সেট হয়ে গেলে আবার নিয়মিত পর্যাপ্ত জল দিতে হবে, অন্যথায় কচি ফল ঝরে যাবে।
-
সূর্যালোক: এটি একটি তীব্র সূর্যপ্রেমী (Sun-loving) গাছ। ফলের কড়া মিষ্টি স্বাদ, প্রচুর রস এবং খোসার সুন্দর গাঢ় কমলা রঙের জন্য দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সরাসরি কড়া ও উজ্জ্বল সূর্যালোক পায় এমন খোলা জায়গায় বা ছাদে ড্রামটি রাখুন।
-
সার প্রয়োগ (নিয়মিত পুষ্টি): সাইট্রাস জাতীয় গাছ প্রচুর খাবার পছন্দ করে (Heavy feeders)।
-
বছরে দুইবার প্রধান সার: বর্ষার আগে (মে-জুন) এবং শীতের শুরুতে (নভেম্বর) ড্রামের চারপাশের মাটি হালকা খুঁড়ে কম্পোস্ট সার, হাড়ের গুঁড়ো, শিং কুচি ও নিম খোল মিশিয়ে দিন।
-
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (Micro-nutrients): সাইট্রাস গাছের পাতা হলুদ হওয়া আটকাতে এবং ফলের পুষ্টির জন্য প্রতি ২ মাসে একবার ১ লিটার জলে ২ গ্রাম চিলেটেড জিংক ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেট (Epsom Salt) গুলে পাতায় স্প্রে করুন।
-
নিয়মিত পুষ্টি: প্রতি ১৫-২০ দিন অন্তর পাতলা সরষের খোল পচা তরল সার দিন। ফল বড় হওয়ার সময় প্রতি মাসে ১ চামচ পটাশ সার (SOP) দিলে ফলের আকার বড় ও মিষ্টি হয়।
-
৩. সাধারণ রোগ, পোকা-মাকড় ও প্রতিকার (Diseases, Pests & Cure)
-
সমস্যা:
-
লিফ মাইনার (Leaf Miner): কচি পাতার ভেতরে সাপের মতো আঁকাবাঁকা দাগ তৈরি করে পাতা কুঁকড়ে দেয়।
-
ডাইব্যাক (Dieback): ছত্রাকের আক্রমণে গাছের ডাল ওপর থেকে ধীরে ধীরে শুকিয়ে কালো হয়ে মরে যেতে থাকে।
-
মিলিবাগ ও স্কেল পোকা: কচি ডাল ও ফলের বোঁটা থেকে রস চুষে খেয়ে গাছকে দুর্বল করে ফেলে।
-
-
প্রতিকার:
-
নতুন পাতা গজানোর সময় প্রতি ১০ দিন অন্তর ১ লিটার জলে ২ মিলি নিম তেল এবং কয়েক ফোঁটা লিকুইড সোপ মিশিয়ে স্প্রে করুন।
-
ডাইব্যাক রোগ এড়াতে এবং গাছকে সুস্থ রাখতে মাসে একবার ১ লিটার জলে ২ গ্রাম ফাঙ্গিসাইড (যেমন: সাফ বা ব্লু-কপার) গুলে পুরো গাছে এবং গোড়ার মাটিতে স্প্রে করুন।
-
ভ্যালেন্সিয়া কমলার একটি মজার বৈশিষ্ট্য (Regreening): ভ্যালেন্সিয়া কমলার ফল গাছে খুব দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকতে পারে। অনেক সময় ফল সম্পূর্ণ পেকে কমলা হয়ে যাওয়ার পরও যদি গাছে রেখে দেওয়া হয়, তবে বসন্তের গরমে গাছের ক্লোরোফিল সক্রিয় হয়ে ওঠায় পাকা কমলাটি আবার হালকা সবুজ রঙে ফিরে যেতে পারে (যাকে Regreening বলা হয়)। তবে এতে স্বাদের কোনো পরিবর্তন হয় না, ফলটি ভেতরে মিষ্টিই থাকে।
















