মিঠুয়া (Mithua Mango)
ইতিহাস ও নামকরণ: ‘মিঠুয়া’ মূলত পূর্ব ভারতের, বিশেষ করে বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দেশি জাতের হেরিটেজ আম। হিন্দি ও মৈথিলি ভাষার ‘মিঠা’ বা ‘মিঠাস’ (যার অর্থ মিষ্টি) শব্দ থেকে এই আমটির নাম হয়েছে ‘মিঠুয়া’। নামের সত্যতা প্রমাণ করেই এই আমটি কাঁচা অবস্থা থেকেই তার মিষ্টতার জন্য অত্যন্ত সুপরিচিত। বিহার এবং বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে গ্রীষ্মকালের শুরুতে এই আমটি অন্যতম প্রথম মিষ্টি ফল হিসেবে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছায়। বাণিজ্যিক স্তরে খুব বড় আকারে এর চাষ না হলেও, গ্রামীণ বাগান ও প্রাচীন পারিবারিক খামারগুলোতে এটি একটি অত্যন্ত প্রিয় ঘরোয়া জাত।
উৎস: বিহার (প্রধানত উত্তর ও মধ্য বিহার অঞ্চল), ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। গাছের বৃদ্ধি: মাঝারি থেকে শক্তিশালী এবং বেশ ঝোপালো ও সুষম আকৃতির ক্যানোপি (Moderately Vigorous and Compact Canopy)। ফলন: উচ্চ ফলনশীল (Good to Heavy Yielder)। মরশুমে গাছজুড়ে প্রচুর পরিমাণে ফল ধরে। ফলনের ধরন: মূলত নিয়মিত বা প্রতি বছর বেশ ভালো ফলন দেয় (Regular Bearer)। টিএসএস ব্রিক্স (মিষ্টতা): ২০ – ২২ (চমৎকার তীব্র মিষ্টতা)। ওজন: ১৫০ – ২৫০ গ্রাম (ছোট থেকে মাঝারি আকার, কিছুটা গোলগাল বা ওভাল শেপ)। গায়ের রঙ: এর বাহ্যিক রূপ বেশ চমৎকার। কাঁচা অবস্থায় হালকা সবুজ থাকলেও, সম্পূর্ণ পাকার পর এর ত্বকটি একটি মনোহর হলুদাভ-সবুজ বা হালকা সোনালী-হলুদ রঙ ধারণ করে। এর চামড়া বেশ মসৃণ ও পাতলা হয়। শাঁসের রঙ: আকর্ষণীয় গাঢ় হলুদ থেকে উজ্জ্বল কমলা-হলুদ। পাকার সময়: এটি মূলত একটি আগাম মরশুমের (Early Season) জাত। সাধারণত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু করে পুরো মে মাসের মাঝামাঝি বা শেষ সপ্তাহের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ পাকার এবং খাওয়ার উপযুক্ত সময়। বাজারে যখন অন্য অনেক নামি আম আসতে শুরু করে, মিঠুয়া ততক্ষণে তার মরশুম শেষ করে আনে। সংরক্ষণ গুণমান: মাঝারি (Medium shelf life)। চামড়া পাতলা এবং অত্যন্ত রসালো হওয়ায় পাকার পর ঘরের তাপমাত্রায় ৩-৪ দিনের মধ্যে এটি খেয়ে ফেলা উত্তম। স্বাদ ও সুবাস: মিঠুয়া আমটি তার তীব্র মিষ্টি স্বাদ এবং চমৎকার ফ্রুটি সুবাসের জন্য বিখ্যাত। এটি মূলত একটি দারুণ চুষে খাওয়ার আম (Juicy/Sucking Variety)। এর শাঁস অত্যন্ত নরম ও তরল রসে ভরপুর থাকে। ফলটিকে হাত দিয়ে ভালো করে চেপে চেপে নরম করে বোঁটার অংশটি ফুটো করে সরাসরি মুখে চুষে খেতে হয়। রসকে ধরে রাখার জন্য এর শাঁসে খুব সূক্ষ্ম ও নরম আঁশ (Fine fiber) থাকে, যা খাওয়ার সময় মুখে একেবারেই বাঁধে না। এর মিষ্টতা অত্যন্ত কড়া ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। সরাসরি চুষে খাওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবারগুলোতে এই আমের রস বের করে তাজা জুস বা আমের ক্ষীর তৈরিতে এটি ব্যবহার করা হয়।
(তথ্যসূত্র: বিহার রাজ্য উদ্যানপালন বিভাগ, মালদা আম গবেষণা কেন্দ্র এবং আঞ্চলিক দেশি আম বৈচিত্র্য সংরক্ষণ রেকর্ড)







