ব্লাড রেড মাল্টা বা অরেঞ্জ (Blood Red Malta / Orange) সাইট্রাস বা লেবু জাতীয় ফলের জগতে অন্যতম আকর্ষণীয়, দামী এবং একটি প্রিমিয়াম জাত। সাধারণ মাল্টা বা কমলার ভেতরের শাঁস যেখানে হালকা হলুদ বা কমলা রঙের হয়, সেখানে এই জাতটির মূল ইউএসপি (USP) হলো—এর ভেতরের শাঁসটি চমৎকার রক্তবর্ণ বা গাঢ় লাল (Blood Red) রঙের হয়ে থাকে।
ছাদবাগানের হাফ ড্রামে বা টবে এই আকর্ষণীয় ও পুষ্টিগুণে ভরপুর ফলটি খুব সুন্দরভাবে চাষ করা সম্ভব।
ব্লাড রেড মাল্টা / অরেঞ্জ (Blood Red Malta)
-
বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name): Citrus sinensis ‘Blood Red’
-
উৎস ও পরিচিতি: এই জাতের কমলা বা মাল্টা মূলত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল (বিশেষ করে ইতালি ও স্পেন) এবং পাকিস্তানের কিছু শুষ্ক ও ঠান্ডা অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে প্রচুর চাষ হয়। তবে বর্তমানে উন্নত গ্রাফটিং বা কলমের মাধ্যমে আমাদের সমতলের গরম আবহাওয়ায় ছাদবাগানেও এটি সফলভাবে ফলন দিচ্ছে।
-
ফলের বৈশিষ্ট্য: এর ফলগুলো আকারে মাঝারি থেকে বেশ বড় এবং নিখুঁত গোলাকার হয়। কাঁচা অবস্থায় ফলটি সবুজ থাকে। তবে পাকার সাথে সাথে এর বাইরের খোসায় একটি লালচে আভা বা পুরোপুরি গাঢ় কমলা-লাল রঙ ফুটে ওঠে। এর খোসাটি মাঝারি পুরু এবং খুব সুন্দর সুগন্ধযুক্ত হয়।
-
রক্তবর্ণ শাঁসের রহস্য (Anthocyanin): এর ভেতরের শাঁস বা কোয়াগুলো গাঢ় লাল বা মেরুন রঙের হওয়ার কারণ হলো এতে প্রচুর পরিমাণে ‘অ্যান্থোসায়ানিন’ (Anthocyanin) নামক শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। সাধারণত ফল পাকার সময়ে রাতের তাপমাত্রা কিছুটা কম বা ঠান্ডা হলে ভেতরের এই লাল রঙটি সবচেয়ে নিখুঁত এবং গাঢ় হূয়ে ফুটে ওঠে।
-
স্বাদ ও পুষ্টি: এর স্বাদ অত্যন্ত চমৎকার এবং অনন্য। এটি কেবল মিষ্টি নয়, বরং এর মধ্যে একটি স্ট্রবেরি বা রাস্পবেরির মতো হালকা রাজকীয় ফ্লেভার (Rich, sweet with a hint of berry flavor) থাকে। সাধারণ মাল্টার চেয়ে এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন-সি এর পরিমাণ অনেক বেশি থাকে।
১. মাটির মিশ্রণ ও ড্রাম নির্বাচন
ব্লাড রেড মাল্টা গাছ গোড়ায় জল জমে থাকা একদম সহ্য করতে পারে না। এর জন্য হালকা, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও দ্রুত জলনিকাশী মাটি প্রয়োজন। আদর্শ মিশ্রণ:
-
বাগানের সাধারণ দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি: ৫০%
-
ভার্মিকম্পোস্ট বা পুরনো পচা গোবর সার: ৩০%
-
নদীর কাদারহিত বালি বা পার্লাইট: ২০%
-
(মাটির পুষ্টি ও সুরক্ষার জন্য এর সাথে ২ মুঠো হাড়ের গুঁড়ো, ২ মুঠো শিং কুচি, ২ মুঠো নিম খোল এবং ১ চামচ ফাঙ্গিসাইড পাউডার খুব ভালো করে মিশিয়ে মাটি তৈরি করুন)।
-
টব বা ড্রামের আকার: শুরুতে ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চির টব ব্যবহার করলেও, গাছটির বয়স ১ বছর পেরিয়ে গেলে ভালো সাইজের ফল পেতে একে অবশ্যই ১৮ থেকে ২২ ইঞ্চির একটি হাফ ড্রামে প্রতিস্থাপন করতে হবে। ড্রামের নিচে জল নিষ্কাশনের ছিদ্র ব্যবস্থা যেন পারফেক্ট থাকে।
২. পরিচর্যা নির্দেশিকা (Care Guide)
-
জল দেওয়ার নিয়ম: মাটিতে সবসময় হালকা আর্দ্রতা বজায় রাখুন, কিন্তু মাটি কাদা বা প্যাচপ্যাচে করবেন না। মাটির ওপরের স্তর সামান্য শুকিয়ে গেলেই জল দিন। বিশেষ সতর্কতা: শীতের শুরুতে বা বসন্তে গাছে যখন নতুন পাতা এবং ফুলের কুঁড়ি আসবে, তখন জল দেওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিতে হবে (মাটি যেন একদম শুকিয়ে কাঠ না হয়)। এই সময়ে অতিরিক্ত জল দিলে সব ফুল ঝরে যাবে। ফুল থেকে গুটি সেট হয়ে গেলে আবার নিয়মিত পর্যাপ্ত জল দিতে হবে।
-
সূর্যালোক: এটি একটি তীব্র সূর্যপ্রেমী (Sun-loving) গাছ। ফলের কড়া মিষ্টি স্বাদ, প্রচুর রস এবং ভেতরের চমৎকার লাল রঙ ফুটে ওঠার জন্য দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সরাসরি কড়া ও উজ্জ্বল সূর্যালোক পায় এমন খোলা জায়গায় বা ছাদে ড্রামটি রাখুন।
-
সার প্রয়োগ (নিয়মিত পুষ্টি):
-
বছরে দুইবার প্রধান সার: বর্ষার আগে (মে-জুন) এবং শীতের শুরুতে (নভেম্বর) ড্রামের চারপাশের মাটি হালকা খুঁড়ে কম্পোস্ট সার, হাড়ের গুঁড়ো, শিং কুচি ও নিম খোল মিশিয়ে দিন।
-
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (Micro-nutrients): সাইট্রাস গাছের পাতা হলুদ হওয়া আটকাতে প্রতি ২ মাসে একবার ১ লিটার জলে ২ gram চিলেটেড জিংক ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেট (Epsom Salt) গুলে পাতায় স্প্রে করুন।
-
নিয়মিত পুষ্টি: প্রতি ১৫-২০ দিন অন্তর পাতলা সরষের খোল পচা তরল সার দিন। ফল বড় হওয়ার সময় প্রতি মাসে ১ চামচ পটাশ সার (SOP) বা কলার খোসা ভেজানো জল দিলে ফলের মিষ্টি ভাব ও ভেতরের লাল রঙ খুব সুন্দর হয়।
-
৩. সাধারণ রোগ, পোকা-মাকড় ও প্রতিকার (Diseases, Pests & Cure)
-
সমস্যা:
-
লিফ মাইনার (Leaf Miner): কচি পাতার ভেতরে সাপের মতো আঁকাবাঁকা দাগ তৈরি করে পাতা কুঁকড়ে দেয়।
-
ডাইব্যাক (Dieback): ছত্রাকের আক্রমণে গাছের ডাল ওপর থেকে ধীরে ধীরে শুকিয়ে কালো হয়ে মরে যেতে থাকে।
-
-
প্রতিকার:
-
নতুন পাতা গজানোর সময় প্রতি ১০ দিন অন্তর ১ লিটার জলে ২ মিলি নিম তেল এবং কয়েক ফোঁটা লিকুইড সোপ মিশিয়ে স্প্রে করুন।
-
ডাইব্যাক রোগ এড়াতে এবং গাছকে সুস্থ রাখতে মাসে একবার ১ লিটার জলে ২ গ্রাম ফাঙ্গিসাইড (যেমন: সাফ বা ব্লু-কপার) গুলে পুরো গাছে এবং গোড়ার মাটিতে স্প্রে করুন।
-
বাগানীদের জন্য কুইক টিপস: আমাদের দেশের আবহাওয়ায় অনেক সময় গরমের কারণে এর খোসার বাইরের অংশটি পুরোপুরি লাল বা কমলা না হয়ে হালকা সবুজ-হলুদ থাকতে পারে, কিন্তু ফলটি গাছে বেশিদিন রাখলে এবং শীতের ছোঁয়া পেলে এর ভেতরের শাঁসটি চমৎকার ব্লাড রেড বা লাল রঙে ভরে যায়। সবসময় বিশ্বস্ত (APU Nursery) অপু নার্সারি থেকে গ্রافটিং বা জোড় কলমের তৈরি আসল চারা সংগ্রহ করবেন।
















