ইন্ডিয়ান সিকি মোসাম্বি (Indian Siki Mosambi) বর্তমান সময়ে ছাদবাগানীদের এবং সাইট্রাস প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত কৌতূহল উদ্দীপক এবং আকর্ষণীয় একটি মিষ্টি লেবুর জাত। সাধারণ মোসাম্বির তুলনায় এর বিশেষ বাহ্যিক গঠন এবং চমৎকার মিষ্টি স্বাদের কারণে এটি দ্রুত ছাদবাগানের টব ও হাফ ড্রামে জায়গা করে নিচ্ছে। সমতলের কড়া রোদ, তীব্র গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়া এটি খুব সহজেই সহ্য করতে পারে।
ইন্ডিয়ান সিকি মোসাম্বি (Indian Siki Mosambi)
-
নাম রহস্য ও পরিচিতি: এই জাতটির নামের পেছনে একটি দারুণ মজার কারণ রয়েছে। ‘সিকি’ বা ‘সিক্কা’ (Siki/Sikka) শব্দের অর্থ হলো কয়েন বা মুদ্রা। এই মোসাম্বিটির নিচের অংশে (পেছনের দিকে) একটি নিখুঁত বৃত্তাকার বা পয়সার মতো গোল দাগ (Coin Mark) থাকে, যা দেখতে হুবহু পুরনো দিনের চার আনা বা সিকি পয়সার মতো লাগে। এই বিশেষ চিহ্নের কারণেই (APU Nursery) অপু নার্সারি ও বাগানীদের মহলে এটি “সিকি মোসাম্বি” নামে পরিচিত।
-
ফলের বৈশিষ্ট্য: এর ফলগুলো আকারে মাঝারি থেকে বেশ বড়, নিটোল গোলাকার এবং ওজনে বেশ ভারী হয়। কাঁচা অবস্থায় ফলটি গাঢ় সবুজ থাকলেও সম্পূর্ণ পাকার পর এর গায়ের মসৃণ খোসাটি আকর্ষণীয় হালকা হলুদ বা লেবু-হলুদ (Light Yellow) রঙ ধারণ করে। এর খোসাটি মাঝারি পাতলা প্রকৃতির হয়।
-
স্বাদ ও শাঁস: সিকি মোসাম্বির শাঁসটি অত্যন্ত নরম, কম বীজযুক্ত এবং প্রচণ্ড রসালো (Highly Juicy) হয়। এর রস মধুর মতো মিষ্টি (High Sugar Content) এবং খাওয়ার পর মুখে কোনো তিতকুটে ভাব বা চড়া সাইট্রাস টক ভাব থাকে না। এটি সরাসরি কোয়া ছাড়িয়ে খাওয়ার জন্য এবং রিফ্রেশিং জুস তৈরির জন্য একটি চমৎকার প্রিমিয়াম জাত।
-
গাছের ধরন (Plant Type): এটি একটি শক্ত কান্ডবিশিষ্ট, বহু-শাখা যুক্ত, বেশ ঝোপালো এবং চিরসবুজ (Evergreen) বহুবর্ষজীবী গাছ। এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ ও সুগন্ধযুক্ত হয়। এটি একটি স্ব-পরাগায়িত (Self-fertile) জাত। সাধারণত বসন্তের শুরুতে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) গাছে সুগন্ধি সাদা ফুল আসে এবং শীতের শুরুতে (নভেম্বর-জানুয়ারি) ফল সম্পূর্ণ পেকে তোলার উপযোগী হয়।
১. মাটির মিশ্রণ ও ড্রাম নির্বাচন
অন্যান্য সাইট্রাস বা মোসাম্বি গাছের মতোই সিকি মোসাম্বি গাছ গোড়ায় জল জমে থাকা একদম সহ্য করতে পারে না। এর জন্য হালকা, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও দ্রুত জলনিকাশী মাটি প্রয়োজন। আদর্শ মিশ্রণ:
-
বাগানের সাধারণ দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি: ৫০%
-
ভার্মিকম্পোস্ট বা পুরনো পচা গোবর সার: ৩০%
-
নদীর কাদারহিত বালি বা পার্লাইট: ২০%
-
(মাটির পুষ্টি ও সুরক্ষার জন্য এর সাথে ২ মুঠো হাড়ের গুঁড়ো, ২ মুঠো শিং কুচি, ২ মুঠো নিম খোল এবং ১ চামচ ফাঙ্গিসাইড পাউডার খুব ভালো করে মিশিয়ে মাটি তৈরি করুন)।
-
টব বা ড্রামের আকার: যেহেতু এই জাতের ফলন প্রচুর হয়, তাই এর জন্য বড় ড্রাম প্রয়োজন। শুরুতে ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চির টব ব্যবহার করলেও, গাছটির বয়স ১ বছর পেরিয়ে গেলে একে অবশ্যই ১৮ থেকে ২২ ইঞ্চির একটি হাফ ড্রামে প্রতিস্থাপন করতে হবে। ড্রামের নিচে জল নিষ্কাশনের ছিদ্র ব্যবস্থা যেন নিখুঁত থাকে।
২. পরিচর্যা নির্দেশিকা (Care Guide)
-
জল দেওয়ার নিয়ম: মাটিতে সবসময় হালকা আর্দ্রতা বজায় রাখুন, কিন্তু মাটি কাদা বা প্যাচপ্যাচে করবেন না। মাটির ওপরের স্তর সামান্য শুকিয়ে গেলেই জল দিন। বিশেষ সতর্কতা: শীতের শেষে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) গাছে যখন নতুন পাতা এবং ফুলের কুঁড়ি আসবে, তখন জল দেওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিতে হবে (মাটি যেন একদম শুকিয়ে কাঠ না হয়)। এই সময়ে অতিরিক্ত জল দিলে সব ফুল ঝরে যাবে। ফুল থেকে গুটি সেট হয়ে গেলে আবার নিয়মিত পর্যাপ্ত জল দিতে হবে, অন্যথায় কচি ফল ঝরে যাবে।
-
সূর্যালোক: এটি একটি তীব্র সূর্যপ্রেমী (Sun-loving) গাছ। ফলের কড়া মিষ্টি স্বাদ, প্রচুর রস এবং খোসার সুন্দর হলুদ রঙের জন্য দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সরাসরি কড়া ও উজ্জ্বল সূর্যালোক পায় এমন খোলা জায়গায় বা ছাদে ড্রামটি রাখুন।
-
সার প্রয়োগ (নিয়মিত পুষ্টি): মোসাম্বি গাছ প্রচুর খাবার পছন্দ করে (Heavy feeders)।
-
বছরে দুইবার প্রধান সার: বর্ষার আগে (মে-জুন) এবং শীতের শুরুতে (নভেম্বর) ড্রামের চারপাশের মাটি হালকা খুঁড়ে কম্পোস্ট সার, হাড়ের গুঁড়ো, শিং কুচি ও নিম খোল মিশিয়ে দিন।
-
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (Micro-nutrients): সাইট্রাস গাছের পাতা হলুদ হওয়া আটকাতে প্রতি ২ মাসে একবার ১ লিটার জলে ২ গ্রাম চিলেটেড জিংক ও ম্যাগনেসিয়ামসিলফেট (Epsom Salt) গুলে পাতায় স্প্রে করুন।
-
নিয়মিত পুষ্টি: প্রতি ১৫-২০ দিন অন্তর পাতলা সরষের খোল পচা তরল সার দিন। ফল বড় হওয়ার সময় প্রতি মাসে ১ চামচ পটাশ সার (SOP) বা কলার খোসা ভেজানো জল দিলে ফলের আকার বড়, রসালো ও মিষ্টি হয়।
-
৩. সাধারণ রোগ, পোকা-মাকড় ও প্রতিকার (Diseases, Pests & Cure)
-
সমস্যা:
-
লিফ মাইনার (Leaf Miner): কচি পাতার ভেতরে সাপের মতো আঁকাবাঁকা দাগ তৈরি করে পাতা কুঁকড়ে দেয়।
-
সাইট্রাস ক্যাঙ্কার (Citrus Canker): ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যার ফলে পাতা ও ফলের গায়ে খসখসে বাদামী দাগ পড়ে।
-
-
প্রতিকার:
-
নতুন পাতা গজানোর সময় প্রতি ১০ দিন অন্তর ১ লিটার জলে ২ মিলি নিম তেল এবং কয়েক ফোঁটা Lickuid Soap মিশিয়ে স্প্রে করুন।
-
ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ এড়াতে মাসে একবার ১ লিটার জলে ২ গ্রাম ফাঙ্গিসাইড (যেমন: কপার অক্সিক্লোরাইড বা ব্লু-কপার) গুলে পুরো গাছে এবং গোড়ার মাটিতে স্প্রে করুন।
-
পরামর্শ: বারি-১ মাল্টার মতো সিকি মোসাম্বির পেছনের কয়েন মার্ক বা সিকি দাগটি একে আলাদাভাবে চিনতে সাহায্য করে। ছাদবাগানে মিষ্টি ও অত্যন্ত রসালো মোসাম্বির স্বাদ পেতে এটি একটি চমৎকার এবং নিশ্চিত ফলনশীল জাত। সবসময় বিশ্বস্ত (APU Nursery) অপু নার্সারি থেকে গ্রাফটিং বা জোড় কলমের তৈরি আসল চারা সংগ্রহ করবেন।
















