কিনো কমলা (Kinnow Orange) ভারতীয় উপমহাদেশে—বিশেষ করে ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান এবং পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া সবচেয়ে সফল, জনপ্রিয় এবং উচ্চ ফলনশীল সাইট্রাস বা ম্যান্ডারিন জাতীয় ফলের জাত। অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির এবং সমতলের তীব্র গরম আবহাওয়া খুব সহজেই সহ্য করতে পারায়, এটি ছাদবাগানীদের কাছে একটি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও চমৎকার জাত হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
কিনো কমলা (Kinnow Orange)
-
বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name): Citrus nobilis × Citrus deliciosa ‘Kinnow’
-
উৎস ও ইতিহাস: এটি একটি হাইব্রিড বা সংকর জাত। ১৯৩৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইট্রাস এক্সপেরিমেন্ট স্টেশনে বিজ্ঞানী এইচ. বি. ফ্রস্ট (H.B. Frost) দুটি বিশেষ সাইট্রাস জাত—’কিং ম্যান্ডারিন’ (King) এবং ‘উইলো লিফ ম্যান্ডারিন’ (Willow Leaf)-এর মধ্যে ক্রস করিয়ে এই জাতটি তৈরি করেন। পরবর্তীতে ১৯৫০-এর দশকে এটি আমাদের উপমহাদেশে আসে এবং পাঞ্জাবের আবহাওয়ায় বিপ্লব ঘটায়।
-
ফলের বৈশিষ্ট্য: কিনো কমলা আকারে মাঝারি থেকে বেশ বড় এবং আকর্ষণীয় গোলাকার হয়। এর গায়ের খোসাটি অত্যন্ত মসৃণ, চকচকে এবং সম্পূর্ণ পাকার পর গাঢ় সোনালী-কমলা (Deep Golden-Orange) বর্ণ ধারণ করে। এর খোসাটি বেশ শক্ত ও টাইট প্রকৃতির (Tight-skinned) হয়, যার কারণে এটি গাছ থেকে তোলার পরও দীর্ঘ সময় নষ্ট না হয়ে তাজা থাকে (Excellent shelf-life)।
-
স্বাদ ও শাঁস: কিনো কমলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ভেতরের অবিশ্বাস্য রসালো শাঁস। এটি অত্যন্ত জুসি (Juicy) এবং এর স্বাদ তীব্র মিষ্টি ও হালকা টকের এক চমৎকার সুষম মিশ্রণ (Rich, sweet-tart flavor)। এর একটিই ছোট অসুবিধা হলো—এতে বীজের সংখ্যা সাধারণ কমলার চেয়ে কিছুটা বেশি থাকে।
-
গাছের ধরন (Plant Type): এটি একটি অত্যন্ত শক্ত কান্ডবিশিষ্ট, খাড়া প্রকৃতির (Erect growth habit), বহু-শাখা যুক্ত এবং চিরসবুজ (Evergreen) বহুবর্ষজীবী গাছ। এর বৃদ্ধির গতি বেশ দ্রুত এবং এটি যেকোনো প্রতিকূল আবহাওয়া বা সমতলের কড়া গরম খুব সহজেই সহ্য করতে পারে। এটি একটি স্ব-পরাগায়িত (Self-fertile) জাত। সাধারণত বসন্তকালে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) গাছে সুগন্ধি সাদা ফুলে ভরে যায় এবং শীতের শেষে (জানুয়ারি-মার্চ) ফল সম্পূর্ণ পেকে তোলার উপযোগী হয়।
১. মাটির মিশ্রণ ও ড্রাম নির্বাচন
কিনো গাছ অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির হলেও টবের গোড়ায় জল জমে থাকা একদম সহ্য করতে পারে না। এর শিকড়ের ভালো বৃদ্ধির জন্য হালকা ও দ্রুত জলনিকাশী মাটি প্রয়োজন। আদর্শ মিশ্রণ:
-
বাগানের সাধারণ দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি: ৫০%
-
ভার্মিকম্পোস্ট বা পুরনো পচা গোবর সার: ৩০%
-
নদীর কাদা ছাড়া বালি বা পার্লাইট: ২০%
-
(মাটির পুষ্টি ও সুরক্ষার জন্য এর সাথে ২ মুঠো হাড়ের গুঁড়ো, ২ মুঠো শিং কুচি, ২ মুঠো নিম খোল এবং ১ চামচ ফাঙ্গিসাইড পাউডার খুব ভালো করে মিশিয়ে মাটি তৈরি করুন)।
-
টব বা ড্রামের আকার: যেহেতু কিনো গাছ বেশ দ্রুত বাড়ে এবং প্রচুর ফলন ধরে রাখে, তাই এর জন্য বড় ড্রাম প্রয়োজন। শুরুতে ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চির টব ব্যবহার করলেও, গাছটির বয়স ১ বছর পেরোলে একে অবশ্যই ১৮ থেকে ২২ ইঞ্চির একটি হাফ ড্রামে প্রতিস্থাপন করতে হবে। ড্রামের নিচে জল নিষ্কাশনের ছিদ্র ব্যবস্থা যেন নিখুঁত থাকে।
২. পরিচর্যা নির্দেশিকা (Care Guide)
-
জল দেওয়ার নিয়ম: মাটিতে সবসময় হালকা আর্দ্রতা বজায় রাখুন, তবে মাটি কাদা করবেন না। মাটির ওপরের স্তর সামান্য শুকিয়ে গেলেই জল দিন। বিশেষ সতর্কতা: শীতের শেষে গাছে যখন নতুন পাতা এবং ফুলের কুঁড়ি আসবে, তখন জল দেওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিতে হবে (মাটি যেন একদম শুকিয়ে কাঠ না হয়)। এই সময়ে অতিরিক্ত জল দিলে সব ফুল ঝরে যাবে। ফুল থেকে গুটি সেট হয়ে গেলে আবার নিয়মিত পর্যাপ্ত জল দিতে হবে, অন্যথায় কচি ফল ঝরে যাবে।
-
সূর্যালোক: এটি একটি তীব্র সূর্যপ্রেমী (Sun-loving) গাছ। ফলের কড়া মিষ্টি স্বাদ, প্রচুর রস এবং খোসার সুন্দর গাঢ় কমলা রঙের জন্য দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সরাসরি কড়া ও উজ্জ্বল সূর্যালোক পায় এমন খোলা জায়গায় বা ছাদে ড্রামটি রাখুন।
-
সার প্রয়োগ (নিয়মিত পুষ্টি): সাইট্রাস জাতীয় গাছ প্রচুর খাবার পছন্দ করে (Heavy feeders)।
-
বছরে দুইবার প্রধান সার: বর্ষার আগে (মে-জুন) এবং শীতের শুরুতে (নভেম্বর) ড্রামের চারপাশের মাটি হালকা খুঁড়ে কম্পোস্ট সার, হাড়ের গুঁড়ো, শিং কুচি ও নিম খোল মিশিয়ে দিন।
-
মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট (Micro-nutrients): সাইট্রাস গাছের পাতা হলুদ হওয়া আটকাতে এবং ফলের পুষ্টির জন্য প্রতি ২ মাসে একবার ১ লিটার জলে ২ গ্রাম চিলেটেড জিংক ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেট (Epsom Salt) গুলে পাতায় স্প্রে করুন।
-
নিয়মিত পুষ্টি: প্রতি ১৫-২০ দিন অন্তর পাতলা সরষের খোল পচা তরল সার দিন। ফল বড় হওয়ার সময় প্রতি মাসে ১ চামচ পটাশ সার (SOP) দিলে ফলের আকার বড় ও মিষ্টি হয়।
-
৩. সাধারণ রোগ, পোকা-মাকড় ও প্রতিকার (Diseases, Pests & Cure)
-
সমস্যা:
-
লিফ মাইনার (Leaf Miner): কচি পাতার ভেতরে সাপের মতো আঁকাবাঁকা দাগ তৈরি করে পাতা কুঁকড়ে দেয়।
-
সাইট্রাস ক্যাঙ্কার (Citrus Canker): ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যার ফলে পাতা ও ফলের গায়ে খসখসে বাদামী দাগ পড়ে।
-
মিলিবাগ ও স্কেল পোকা: কচি ডাল ও ফলের বোঁটা থেকে রস চুষে খেয়ে গাছকে দুর্বল করে ফেলে।
-
-
প্রতিকার:
-
নতুন পাতা গজানোর সময় প্রতি ১০ দিন অন্তর ১ লিটার জলে ২ মিলি নিম তেল এবং কয়েক ফোঁটা লিকুইড সোপ মিশিয়ে স্প্রে করুন।
-
ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ এড়াতে মাসে একবার ১ লিটার জলে ২ গ্রাম ফাঙ্গিসাইড (যেমন: কপার অক্সিক্লোরাইড বা ব্লু-কপার) গুলে পুরো গাছে এবং গোড়ার মাটিতে স্প্রে করুন।
-
পরামর্শ: সমতলের গরম আবহাওয়ায় ছাদবাগানে কমলার স্বাদ ও প্রচুর রস পেতে চাইলে কিনো একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য জাত। সবসময় বিশ্বস্ত (APU Nursery) অপু নার্সারি থেকে গ্রافটিং বা জোড় কলমের তৈরি আসল “কিনো কমলা” এর চারা সংগ্রহ করবেন। কলমের চারা হলে লাগানোর ১ম বা ২য় বছর থেকেই গাছ জুড়ে থোকা থোকা উজ্জ্বল কমলা ফল ধরে থাকবে।
















